বঙ্কিমচন্দ্রের জীবদ্দশায় ‘আনন্দমঠ’-এর পঞ্চম বা শেষ সংস্করণটি প্রকাশিত হয় ১৮৯২ সালে। দীর্ঘ কয়েকশ বছরের ইসলামিক শাসনের সমাপ্তি এবং ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নের সন্ধিক্ষণের দুঃসহ সময়ে অনাবৃষ্টি ও করের বোঝা বাংলার বুকে নিয়ে এসেছিল যে ভয়ংকর শস্যসংকট ও মহাদুর্ভিক্ষ, অসংখ্য নরহন্তা সেই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ছিল এই মহান উপন্যাসের পটভূমি। আর এই নিপীড়ন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সমসাময়িক কালের সন্ন্যাসী-ফকিরদের বিদ্রোহ বঙ্কিমচন্দ্রকে উদ্বুদ্ধ করেছিল আধ্যাত্মিক পথে বিপ্লবের ভাবনায়। ব্রহ্মচর্য, ত্যাগ ও সঙ্ঘবদ্ধ জীবনের মধ্য দিয়েই দেশমাতৃকা তথা জাতির মুক্তি সম্ভব এই ভাবনাতেই গড়ে ওঠে তাঁর কল্পিত সন্ন্যাসীদের সন্তানদল। মন্বন্তরের মূল কারণই ছিল মুসলমান শাসকের দীর্ঘকালীন শোষণ-অপশাসন, তাই তার অবসান চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু প্রথমবারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সন্তানদের জয়ের আতিশয্যে মুসলমান মহল্লায় লুঠপাঠ, অত্যাচার, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অমানবিক কার্যকলাপও কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের কলম এড়ায় নি। তাই আনন্দমঠ-কে ‘সাম্প্রদায়িক’ উপন্যাস বলে দেগে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে সংকীর্ণতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিলে অতিরঞ্জন হয় না। ‘তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা প্রকৃত সনাতনধর্ম নয়, সে একটা অপকৃষ্ট ধর্ম’—একথা লিখবার সাহস বঙ্কিমচন্দ্র সত্যিই ‘সাম্প্রদায়িক’ হলে রাখতেন কি? তেমনি বঙ্কিমচন্দ্রের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার তোষণের অভিযোগ আনাও মূঢ়তার সামিল। যতই মুসলমান শাসকের বিরোধিতার কথা বলা হোক, উপন্যাসে বারবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে কিন্তু সেই গোরাদের সঙ্গেই। স্বামী বিবেকানন্দ বা রামমোহনের মতোই তিনিও চেয়েছিলেন স্বাধীনতার দাবী করার আগে ইংরেজ শাসনাধীনেই স্বাধীনতার উপযুক্ত হতে হবে। তাঁরই কথায়, ‘যতদিন সাহেবদিগের সমকক্ষ না হও, সাহেবদিগের সহিত বিবাদ করিও না। যখন ইংরেজের সমকক্ষ হইবে তখনকার আনন্দমঠ তখনকার গ্রন্থকার রচনা করিবেন।’ সত্যিই বিংশ শতকের সূচনাতেই দেখা গেল, আনন্দমঠ-বন্দেমাতরম্ হয়ে উঠল বিপ্লবের মূল মন্ত্র। প্রকৃতপক্ষেই ‘আনন্দমঠ’-এ এমন অমোঘ শক্তি নিহিত রয়েছে যা যুগে যুগে যে কোনো মুক্তিযুদ্ধে সাড়া জাগাতে পারে।
| ISBN: | 978-81-686567-0-3 |
| Publish Date: | 14-08-2026 |
| Page: | 176 |
| Language: | Bengali |
| Binding: | Hardboard |